বেতার স্মৃতি- ৫ : হাসান মীর


 বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর বার্তা বিভাগে সাব- এডিটর, অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর ও নিউজ এডিটর, এই তিনটি পদ থাকলেও কখনো মাত্র একজন আবার কখনো দুজনের বেশী অফিসার থাকেননা। স্বাধীনতা - উত্তর কালে আমি রাজশাহী কেন্দ্রে যোগদানের সময় আমজাদ হোসেন সাহেব নিউজ এডিটর বা বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন, তার কথা আগের লেখায় উল্লেখ করেছি। এছাড়া সংবাদ সংগ্রহ ও লেখার ব্যাপারে তাকে সহায়তা করতেন এই কেন্দ্রেরই অবসরপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ আলী আহমদ। মাসিক চুক্তিভিত্তিক এই কাজের জন্য তাকে চারশো টাকা করে ফি দেয়া হতো। এর বাইরে তিনি শাহ মখদুম দরগা এস্টেটের তত্ত্বাবধারক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। সেখানে বেতন ছাড়াও বাড়তি সুবিধা ছিল ছোট একটি বাসা। স্ত্রী আর তিন মেয়ে নিয়ে সেখানে কষ্ট করে থাকতেন।
আলী আহমদ সাহেব ছিলেন ভাগ্য বিড়ম্বিত ব্যক্তি। তিনি বৃটিশ আমলে কোলকাতা আর দিল্লী এবং সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পর করাচি, ঢাকা, ইসলামাবাদ হয়ে শেষ পর্যন্ত রাজশাহীতে আসেন। তিনি সম্ভবত ১৯৭০ সালের শেষ দিকে অবসরগ্রহণ করেন কিন্তু সাতচল্লিশের আগেপরে তিনি যে নানা জায়গায় বিভিন্ন পদে চাকরি করেছেন তার কোন তথ্য প্রমাণ তার কাছে ছিলনা, নানা জটিলতায় তার মূল সার্ভিস বুক বা প্রমাণাদি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিলনা এবং তিনি পেনশনও পাচ্ছিলেননা।এ কারনে বাধ্য হয়েই, যে অফিসে তিনি এক সময় কর্তা ব্যক্তি ছিলেন, সেখানেই সামান্য অর্থের বিনিময়ে চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করতে হচ্ছিল।
আলী আহমদ সাহেব, যিনি বন্ধু মহলে নান্না মিয়া বা নান্না ভাই বলে পরিচিত ছিলেন, তিনি ছিলেন পুরাতন ধ্যান ধারণার মানুষ, পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাস করতেন। একাত্তর সালে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া তার ছেলেটি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য সীমান্তের ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তিনি তাকে আল বদর বাহিনীতে ভর্তি হতে বাধ্য করলেন। সেখানে সে নিজেদের মধ্যে বিরোধে লিপ্ত হয়ে ( এখন যেখানে মুসলিম ইন্সটিটিউট, তখন নাম ছিল জিন্নাহ হল) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেল। প্রথম জীবনে কলকাতায় চাকরি করার সময় তিনি প্রথম বিয়ে করেন। সেই ঘরে তার একটি পুত্র সন্তান ছিল কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ রাখেননি। মায়ের চেষ্টায় তার উচ্চশিক্ষা সম্ভব হয়, তিনি বর্তমানে ভয়েস অফ আমেরিকায় কর্মরত।
আলী আহমদ সাহেব নোয়াখালী অঞ্চলে সৈয়দ বংশীয় এক পীর সাহেবের কন্যাকে বিয়ে করেন, সেই ঘরেই তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে ( ছেলেটির কথা একটু আগে বলেছি) । দরগাহ মহল্লায় একদিন তার বাসায় গিয়েছিলাম। দেখলাম তিনি স্ত্রীকে
" আপনি "বলে সম্বোধন করেন। কারন জানতে চাইলে বলেন ' উনি সৈয়দ কন্যা '।
আলী আহমদ সাহেব( পরের দিকে।নিজের নামের সাথে সোবহানী যুক্ত করেছিলেন) ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে ছিলেন কিন্তু ততদিনেও তার পেনশনের কেস নিষ্পন্ন হয়নি। তার বড় ছেলেটিও এ ব্যাপারে বার কয়েক রাজশাহী এসেছিলেন, আমার সাথে তখন দেখা হয়। যতদূর জানি এর বছর খানেক পর কুমিল্লায় নিজ বাডিতে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সরকারী পেনশন তার ভাগ্যে জোটেনি।
দোষ গুণেই মানুষ। তারা এক সময় লড় কে লেঙ্গে পাকিস্তান বলে আন্দোলন করেছেন ফলে ওই দেশটির প্রতি টান থাকাই স্বাভাবিক। এর বাইরে মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও সদালাপী এবং বাংলা ও ইং রেজি দুই ভাষাতেই সমান দক্ষ ছিলেন। আল্লাহ্‌ তার আত্নাকে শান্তিতে রাখুন ।।


[হাসান মীর ফেইসবুক পেইজ হতে সংকলিত]

Comments